স্বর্ণের মূল্য নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় উঠে ট্রয় আউন্স প্রতি $5,200 অতিক্রম করেছে।মার্কিন ডলারের দরপতনের প্রভাবে স্বর্ণের মূল্যের চলমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে।
বছরের শুরু থেকেই এই মূল্যবান ধাতুটির মূল্য প্রায় 20% বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এই সপ্তাহে প্রথমবার মনস্তাত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আউন্স প্রতি $5,000 লেভেল অতিক্রম করেছে। সেইসাথে রূপার দর স্বর্ণের চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হলো মার্কিন ডলারের দরপতন নিয়ে উদ্বেগ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সক্রিয়ভাবে আমেরিকান মুদ্রা ছাপানোর (যা মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে) কারণে বিনিয়োগকারারা ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। ফিয়াট মুদ্রার তুলনায় স্বর্ণের অন্তর্নিহিত মূল্য থাকায় এটি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির আওতায় পড়ে না, তাই অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বর্ণ মূলধন সংরক্ষণের আকর্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে জোরেশোরে এই আলোচনা চলছে যে বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সম্ভবত রিজার্ভ থেকে মার্কিন সরকারি বন্ডের পরিমাণ কমিয়ে দেবে এবং স্বর্ণ ক্রয়ের মাধ্যমে তাদের রিজার্ভকে বহুমুখী করবে। সুরক্ষাবাদী উদ্যোগ ও ট্রাম্প কর্তৃক শুল্ক আরোপের হুমকিগুলোও মার্কিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার বিষয়ে ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের উপর যে আস্থা রয়েছে তাতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এজন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে স্বর্ণকে বিকল্প বিনিয়োগ হিসেবে যাচাই করছে।
পাশপাশি, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিসমূহ বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে আগ্রহী হতে বাধ্য করছে—আর সেসবের মধ্যে স্বর্ণ সর্বদা অন্যতম। ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ট্রেডার ও বিনিয়োগকারীরা অস্থিরতা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য স্বর্ণ ক্রয়ে প্ররোচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার সম্ভাবনা স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির জন্য সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র সম্ভাব্য যুদ্ধের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব—যেমন তেলের মূল্যের উত্থান ও বাণিজ্য সম্পর্কের বিঘ্নতাই নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার আশংকার মধ্যে রয়েছে।
এছাড়া মনস্তাত্বিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সংক্রান্ত খবর আসলে বিনিয়োগকারারা আরও বেশি রক্ষণশীল কৌশল গ্রহণ করে তাদের মূলধন সুরক্ষিত রাখতে চাইবে; ফলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়বে এবং অবধারিতভাবে এটির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হবে।
তবে এই বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি যে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো সাময়িক। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা হ্রাস পায় তাহলে কারেকশনের অংশ হিসেবে স্বর্ণের মূল্য নিম্নমুখীও হতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীদের অতি সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত এবং পরিপূর্ণ বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
স্বর্ণের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের স্বর্ণের মূল্যের নিকটতম রেজিস্ট্যান্স $5,317 ব্রেক করাতে হবে। এটি ব্রেক করলে স্বর্ণের মূল্যের $5,416-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, এবং এই লেভেল ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বেশ কঠিন হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $5,526 লেভেল নির্ধারণ করা যেতে পারে। অপরদিকে, যদি স্বর্ণের দরপতন হয় তাহলে মূল্য $5,223-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী সেটি বুলিশ পজিশনের জন্য গুরুতর আঘাত হবে এবং স্বর্ণের মূল্য দ্রুত $5,137 পর্যন্ত নেমে আসতে পারে, এবং পরবর্তীতে $5,051-এর দিকে দরপতন হওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে।