তেল কোম্পানি বনাম হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের উদ্যোগ: বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের লড়াই

হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় এবং ইসরায়েল লেবাননের ওপর হামলা চালানোয় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি বিঘ্নিত হতে পারে বলে ব্রেন্ট সহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের মূল্য ২০২০ সালের এপ্রিলের পর থেকে সর্বোচ্চ দৈনিক দরপতনের পরে পুনরুদ্ধার করেছে।

আজ বুধবার 13% দরপতনের পরে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেল প্রতি প্রায় $97 কাছাকাছি পৌঁছায়। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (WTI) দামও প্রায় $97-এ অবস্থান করছে। গতকাল ইরানের আধা সরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স এক প্রতিবেদনে জানায় যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল স্থগিত ছিল, যদিও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই দাবি খণ্ডন করে বলেছেন, "আমরা হরমুজ প্রণালী অবরোধমুক্ত হওয়ার সংকেত দেখছি।"

সার্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি স্পষ্ট যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন নাটক শুরু হয়েছে, যেখানে প্রতি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দর কষাকষির এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। বহুল ক্ষমতাশালী অনেক তেল কোম্পানি, যাদের প্রভাব কেবল কর্পোরেট দপ্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত ইরানের আকাঙ্খিত পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। ইরানের প্রস্তাবিত উদ্যোগ অনুযায়ী এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করার জন্য ফি আরোপ করা হবে—যা তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে রোষের ঝড় তুলেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অবকাঠামো বদলে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে।

তেল কোম্পানিগুলোর মূল আপত্তি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে, যেগুলোর প্রতিটি ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। প্রথমত অর্থনৈতিক প্রভাব। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চালান প্রতি অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় $2.5 মিলিয়ন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই চমকপ্রদ অংকটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে কীভাবে এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। যেসব দেশের অর্থনীতি সরাসরি তেল উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক আঘাত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্মতি বজায় রাখার জটিলতা। প্রণালী ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চার্জ আরোপ করা হলে যদি সেটি সরাসরি ইরানের কাছে পৌঁছায়, তাহলে তা বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কারণ হতে পারে। এর ফলে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোকে গুরুতর আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নিষেধাজ্ঞার জটিল জাল ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা আছে—যা নতুন উত্তেজনার ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে।

সর্বশেষে, আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতার নিদর্শন অগ্রাহ্য করা যায় না। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য ফি ধার্য করার ধারণা কার্যকর হলে প্যান্ডোরা বক্স খুলে যেতে পারে। মালাক্কা প্রণালী কিংবা সুয়েজ কাভালির মতো অন্যান্য প্রধান সামুদ্রিক পথগুলোকে ঘিরেও অনুরূপ পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে, ফলে একই ধরনের ফি আরোপের একটি ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ কার্যক্রম জটিল হয়ে উঠবে। তেল কোম্পানিগুলো আশঙ্কা করছে যে এমন পদক্ষেপ নিয়মে পরিণত হলে সরবরাহ রুটগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

তেলের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের তেলের মূল্যকে নিকটতম রেজিস্ট্যান্স $100.40 অতিক্রম করাতে হবে। এই লেভেল অতিক্রম করলে তেলের মূল্যের $106.83-এর দিকে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যায়, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে। সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $113.36-এর লেভেল নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $92.54-এ থাকা অবস্থায় ক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে; তাঁরা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনগুলোর জন্য গুরুতর আঘাত হবে এবং তেলের দর $86.67-এ নেমে যেতে পারে, পরবর্তীতে সম্ভাব্যভাবে $81.38 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে।