স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি $4,050-এ নেমে এসেছে

স্বর্ণের মূল্য কমে প্রতি আউন্স $4,050-এর নিচে নেমে গেছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। গতকাল ১.৭ শতাংশ দরপতনের পর আজ দিনের শুরুতে ধাতুটির মূল্য আরও ০.৬ শতাংশ কমেছিল, তবে পরবর্তীতে সেই দরপতন কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্বর্ণের উপর এই চাপ মূলত দুটি দিক থেকে আসছে। সপ্তাহের শুরু থেকেই মার্কিন ডলারের দর ০.৬% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ডলারে মূল্যায়িত স্বর্ণের মূল্য স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে। পাশাপাশি, প্রযুক্তি খাতভিত্তিক স্টকের ব্যাপক দরপতনের ফলে বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য খাতের লোকসান পুষিয়ে নিতে স্বর্ণে তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে আনছেন।

এক্ষেত্রে মার্কেটে অস্থিরতার সময় সুপরিচিত পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণ সাধারণত একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বা 'সেফ-হেভেন' অ্যাসেট হিসেবে পরিচিত; কিন্তু মার্কেটে যখন বিভিন্ন খাতে যখন বড় ধরনের দরপতন ঘটে, তখন লিকুইডিটি বা নগদ অর্থের জোগান পেতে স্বর্ণ বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়। প্রযুক্তি খাতভিত্তিক স্টকের দরপতনের কারণে যখন বিনিয়োগকারীদের 'মার্জিন কল' মেটাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, তখন তারা এমন অ্যাসেট বিক্রি করেন যার মূল্য বেড়েছে এবং যা সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায়—আর এক্ষেত্রে স্বর্ণ একটি আদর্শ বিকল্প হয়ে ওঠে। এ কারণেই গতকাল ওয়াল স্ট্রিটে স্টক সূচকে যে দরপতন হয়েছে—যার মূল কারণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতভিত্তিক স্টকের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ—তা এই মূল্যবান ধাতুর মূল্যকেও নিম্নমুখী করেছে।

নগদ অর্থের চাহিদার পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক কারণ এখানে কাজ করছে। মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তো রয়েছেই, সেই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কর্তৃক সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার বা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও প্রবল হচ্ছে। গত সপ্তাহে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের হকিশ বা কঠোর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে এবং ইরানের শান্তি চুক্তির ইতিবাচক প্রভাবকে ম্লান করে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, শিকাগো ফেডের প্রেসিডেন্ট গুলসবি খোলাখুলিভাবে বলেছেন যে মুদ্রাস্ফীতি ভুল পথে এগোচ্ছে; এছাড়া ডয়চে ব্যাংক এবং গোল্ডম্যান শ্যাক্স স্বর্ণের মূল্যের পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে দিয়েছে এবং তারা এ বছর ফেড কর্তৃক সুদের হার কমানোর বিষয়টি আর বিবেচনায় রাখছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতির প্রেক্ষাপটে ট্রেডাররা সম্ভবত কঠোর মুদ্রানীতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বর্ণের মূল্যের বর্তমানে রেঞ্জের দ্রুত কোনো পরিবর্তন আসবে। সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে হকিশ বা কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের ফলাফল এমন হতে হবে যা সুদের হার বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে স্বর্ণ চাপের মধ্যে থাকবে, কারণ বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের চেয়ে সুদের হার সংক্রান্ত প্রত্যাশাই মূলত এই ধাতুর ভাগ্য নির্ধারণ করছে।

এ কারণেই ট্রেডারদের দৃষ্টি এখন বৃহস্পতিবার প্রকাশিতব্য পিসিই সূচকের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। এটি ফেডারেল রিজার্ভের পছন্দের মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপক সূচক এবং ধারণা করা হচ্ছে যে এতে মুদ্রাস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাবে। যদি এই সূচকের মান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়, তবে সুদের হার বাড়ানোর জন্য কঠোর অবস্থান নিশ্চিত হবে, মার্কিন ডলার আরও শক্তিশালী হবে এবং স্বর্ণের মূল্য কমে আউন্স প্রতি $4,000-এর মনস্তাত্ত্বিক সীমার দিকে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর বিপরীতে, পিসিই সূচকের ফলাফল যদি প্রত্যাশার চেয়ে কম বা নিম্নমুখী হয়, তবে এই ধাতুটির ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আজ রূপার মূল্য 0.2% বৃদ্ধি পেয়ে আউন্স প্রতি $61.71-এ পৌঁছেছে, এদিকে প্লাটিনামের দরপতন হচ্ছে এবং প্যালাডিয়ামের মূল্য কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে।

স্বর্ণের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের মূল্যকে নিকটতম রেজিস্ট্যান্স $4,124-এ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এতে করে স্বর্ণের মূল্যের $4,186-এর দিকে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে; যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $4,249 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। দরপতনের ক্ষেত্রে স্বর্ণের মূল্য $4,062 লেভেলে থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। যদি তারা সফল হয়, এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনগুলোর উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং স্বর্ণের মূল্য $4,008-এ নেমে যেতে পারে, ও পরবর্তীতে সম্ভবত $3,954 পর্যন্ত দরপতন হতে পারে।