ঠিক গতকালই আমরা আলোচনা করেছিলাম যে জ্বালানি তেলের মূল্য কীভাবে তলানিতে ঠেকেছে; আর আজ হরমুজ প্রণালীতে বেশ কয়েকটি জাহাজের ওপর হামলার জেরে এই 'কালো সোনার' মূল্য বেড়ে গেছে। এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঝুঁকির বিষয়টি ট্রেডারদের পুনরায় মনে করিয়ে দিয়েছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য 1.1% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি $73-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং ডব্লিউটিআই-এর মূল্য $69 ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক পরিস্থিতির সাথে সাংঘর্ষিক; কারণ অয়েল মার্কেটের মৌলিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এখনও নিম্নমুখী প্রবণতাই বজায় রয়েছে, যার ফলে অধিকাংশ বিশ্লেষকই জ্বালানি তেলের এই মূল্য বৃদ্ধির ঘটনাটিকে সাময়িক বলেই মনে করছেন।
নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার কারণেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ওমান উপসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার পরপরই পণ্যবাহী ট্যাঙ্কার 'আল-রেকায়েতের' ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। যুক্তরাজ্যের 'মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস' এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া অ্যাক্সিওস এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে যে, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল; এতে জাহাজ দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে বিশ্ববাজারের সংযোগকারী এই প্রণালীটি সংঘাতের সময় প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকার পর বর্তমানে আংশিকভাবে পুনরায় চালু হয়েছে। যদিও এর মধ্য দিয়ে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তবুও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ এখনও যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থার তুলনায় কম রয়েছে।
এই হামলাগুলোকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কূটনৈতিক পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাকর পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন যে, হুমকি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে না।
ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে ছাপিয়ে মার্কেটের সামগ্রিক পরিস্থিতি নির্ধারণে এই মৌলিক প্রেক্ষাপটগত দুর্বলতাটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এর সবচেয়ে বড় ইঙ্গিতটি পাওয়া গেছে সৌদি আরামকোর সিদ্ধান্তে; তারা আগামী মাসের জন্য এশিয়ার মার্কেটে 'আরব লাইট' গ্রেডের তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি $11 কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে এটির মূল্য বেঞ্চমার্ক বা নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে $1.50 কমে এসেছে। স্পষ্টতই, সৌদি আরব দাম কমাচ্ছে যাতে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এশীয় ক্রেতাদের জন্য ট্যাঙ্কার ভাড়া করে ওই প্রণালী দিয়ে তেল আনাটা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা সাশ্রয়ী হয়। অন্য কথায়, দেশটি বাজারের বড় অংশ দখলে নেওয়ার লক্ষ্যে জোরদার প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে, যা সরাসরি তেলের মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ওপেকপ্লাস কর্তৃক আগামী মাসে উৎপাদন কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পরপরই রিয়াদের এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছে। যদিও বর্তমানে এই বাড়তি উৎপাদনের বিষয়টি মূলত তাত্ত্বিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তবুও এর ভবিষ্যৎ ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথে ওপেকপ্লাস তেলের সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
আজ প্রকাশিতব্য মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের স্বল্পমেয়াদী পূর্বাভাস থেকে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত মাসে সংস্থাটি ২০২৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন সংক্রান্ত পূর্বাভাস বাড়িয়ে দৈনিক ১৩.৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল নির্ধারণ করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় এবং মার্কেটের মৌলিক উপাদানগুলো তেলের মূল্যকে বিপরীতমুখী বিভিন্ন দিকে ধাবিত করছে। জাহাজের ওপর হামলার ঘটনার ফলে স্বল্পমেয়াদী ঝুঁকির কারণে মূল্যবৃদ্ধি ঘটায় আজ স্বল্পমেয়াদে পুনরুদ্ধারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে; তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং ওপেক প্লাসের কোটা বৃদ্ধি এবং উৎপাদকদের পক্ষ থেকে বড় আকারের মূল্যছাড়ের মতো শক্তিশালী প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $69.58-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $71.69-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $73.79 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $67.22-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $63.79 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $59.96 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।