মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির মধ্যে স্বর্ণের মূল্য হ্রাস পেয়েছে

টানা দ্বিতীয় দিনের মতো স্বর্ণের দরপতন ঘটেছে এবং এটির মূল্য আউন্স প্রতি $4,100-এর গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লেভেলে ফিরে এসেছে। স্বর্ণের এই দরপতনের মূল কারণ বরাবরের মতোই পরস্পরবিরোধী এবং তেলের মূল্যের সাথে সম্পর্কিত।

আজ, ওয়াশিংটন তেহরানের বিশ্বব্যাপী তেল বিক্রির অনুমোদন বাতিল করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলার জবাবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতির হার বৃদ্ধির উদ্বেগ পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে।

এখানে স্বর্ণের দরপতনের পেছনের কারণ বেশ জটিল এবং এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। জ্বালানির তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে এই প্রত্যাশা জোরদার হয় যে, ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় ফেডারেল রিজার্ভ হয়তো আরও দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার উচ্চস্তরে বজায় রাখবে। ঋণের উচ্চ ব্যয় ঐতিহ্যগতভাবে স্বর্ণের জন্য একটি প্রতিকূল পরিস্থিতি, কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না, এবং মার্কিন ডলার শক্তিশালী হলে ক্রেতাদের জন্য ডলারে-মূল্যায়িত ধাতু ক্রয় করা আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। সুতরাং, সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে তা সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ায়, যা স্বর্ণের বিরুদ্ধে কাজ করে, এমনকি ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, যা অন্য পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দিত।

আজকের দিনের প্রধান ইভেন্ট হিসেবে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির জুন মাসের বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশিত হবে। ট্রেডাররা এই কার্যবিবরণী থেকে সুদের হারের ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে সূত্র খুঁজবেন। মনে রাখবেন, সেই জুন মাসের বৈঠকের পর স্বর্ণের মূল্য তীব্রভাবে কমে গিয়েছিল, যখন ফেডের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ ট্রেডারদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হকিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে, গত সপ্তাহে প্রকাশিত কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিবেদনের প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল অবিলম্বে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা হ্রাস করেছে এবং স্বর্ণের মূল্যকে $4,000-এর সাইকোলজিক্যাল লেভেল অতিক্রম করে ঊর্ধ্বমুখী হতে সহায়তা করেছে।

স্বর্ণের সাম্প্রতিক দরপতনের মাত্রা এটাই তুলে ধরে যে মার্কেটে কতটা গুরুতর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বর্ণের মূল্য এক-পঞ্চমাংশের বেশি কমে গেছে এবং মুনাফা তুলে নেওয়ার এই ঢেউ তিন বছরের বুলিশ সাইকেলকে সম্পন্ন করেছে, যা গত মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণের মূল্যের বিয়ারিশ বা নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। একই সাথে, আরও দরপতনের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা যে ব্যাপকভাবে শর্ট পজিশন ওপেন করছেন, তারও কোনো জোরালো প্রমাণ বর্তমানে নেই।

স্বর্ণের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত ভিত্তি অটুট রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদী দরপতনের বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বিষয় হিসেবে কাজ করছে। পিপলস ব্যাংক অফ চায়না জুন মাসেও স্বর্ণ ক্রয় অব্যাহত রেখেছে, যা অন্তত ২০১৫ সালের পর থেকে দীর্ঘতম স্বর্ণের ক্রয়ের ধারাবাহিকতাকে আরও প্রসারিত করেছে এবং মূল্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার বিষয়ে দেশটির অঙ্গীকারকে তুলে ধরেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জুন মাসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, আগামী এক বছরে নিজেদের স্বর্ণ রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনাকারী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

ট্রেডাররা একদিকে ফেডকে ঘিরে স্বল্পমেয়াদে হকিশ বা কঠোর আর্থিক নীতিমালা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়াবলী এবং অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সমর্থনের মধ্যে দোটানায় রয়েছে। আজ দিনের শেষে প্রকাশিতব্য ফেডের কার্যবিবরণী এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তার মূল নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।


স্বর্ণের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের মূল্যকে নিকটতম রেজিস্ট্যান্স $4,124-এ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এতে করে স্বর্ণের মূল্যের $4,186-এর দিকে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে; যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $4,249 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। দরপতনের ক্ষেত্রে স্বর্ণের মূল্য $4,062 লেভেলে থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। যদি তারা সফল হয়, এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনগুলোর উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং স্বর্ণের মূল্য $4,008-এ নেমে যেতে পারে, ও পরবর্তীতে সম্ভবত $3,954পর্যন্ত দরপতন হতে পারে।