টানা ষষ্ঠ দিনের মতো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ নিয়ে আলোচনা থমকে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের দর $89.45-এ পৌঁছেছে

ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের জ্বালানি তেলের দর 0.6 শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি $89.45-এ পৌঁছেছে, যার ফলে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো এটির মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রইল—যা এপ্রিলের পর থেকে দীর্ঘতম ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। অন্যদিকে, ডব্লিউটিআই গ্রেডের তেলের দরও ব্যারেলপ্রতি প্রায় $84.40-এর সেই আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরে এসেছে। এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি; সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা কেবল থমকেই নেই, বরং দৃশ্যত তা উল্টো পথে এগোচ্ছে। উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্যভাবে অনমনীয় হয়ে উঠেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ট্রেডাররা একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক সংকেতকে কার্যত উপেক্ষা করেছে। এই সংঘাতের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি রয়েছে। তা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়তে থাকে; এটি প্রমাণ করে যে, কোনো চুক্তি আসন্ন—এমন দাবির বিষয়ে ট্রেডাররা এখন কতটা সন্দিহান। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের সময়ে ট্রেডাররা বেশ কয়েকবার সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদী হয়েছিল, যার প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ চুক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। বর্তমান প্রতিক্রিয়াটি মূলত এ ধরনের সংকেত বা আশ্বাসের প্রতি ট্রেডারদের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ও অনীহারই বহিঃপ্রকাশ।

উভয় পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণটি সুনির্দিষ্ট এবং সর্বজনবিদিত। ট্রাম্প ইরানের কাছে নতুন কিছু দাবি উত্থাপন করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে সংঘাতের ঘটনায় নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ—এবং তিনি বলেছেন যে, "ভবিষ্যতের সব আলোচনাতেই তিনি অবিরাম নতুন নতুন দাবি জানাতে থাকবেন।" অন্যদিকে তেহরানও হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের শর্তে অটল রয়েছে; তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ। আলোচনার এজেন্ডায় উভয় পক্ষই নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করছে, যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

পরিস্থিতি কতটা গুরুতর তা জাহাজ চলাচলের বাস্তব চিত্র দ্বারা নিশ্চিত করা যায়। জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৪টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করত, সেখানে এখন দিনে মাত্র পাঁচটি জাহাজ যাতায়াত করছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হতো; তাই বর্তমানে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের হার বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ও উল্লেখযোগ্য ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

পরিস্থিতির মূল প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এখনকার তুলনায় পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি অস্থিতিশীল বা বিস্ফোরক হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের মজুদ বিপজ্জনক মাত্রায় কমে গেছে। পাশাপাশি, আগে যেসব বিষয় হরমুজ প্রণালী অবরোধের প্রভাব প্রশমনে সহায়তা করেছিল—যেমন চীন থেকে স্বল্প চাহিদা এবং জরুরি মজুদ থেকে জ্বালানি সরবরাহ—সেগুলোর কার্যকারিতাও এখন প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াই সরবরাহ বিঘ্ন সামলে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া সেই 'সুরক্ষা-বলয়' বা 'সেফটি কুশন' এখন কার্যত ফুরিয়ে গেছে; ফলে নতুন করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা জ্বালানি তেলের মূল্যে অনেক বেশি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

বছরের শুরু থেকেই জ্বালানি তেলের দর প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে এবং পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেড়েছে আরও বেশি; এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেলের মূল্যের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা বজায় থাকবে এবং উভয় পক্ষ একে অপরের কাছে নতুন নতুন দাবি জানাতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক সরবরাহ দ্রুত পুনরুদ্ধারের বিষয়টি ট্রেডারদের বিবেচনায় আসার কোনো কারণ নেই—যা বর্তমান পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্যকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $84.40-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $86.60-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $89.56 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $81.50-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $78.70 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $76.30 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।