বৃহস্পতিবার 2%-এর বেশি মূল্য বৃদ্ধির পর স্বর্ণের মূল্য প্রতি আউন্স $4,480-এর কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। রুপার দর সামান্য বেড়ে 0.1% বৃদ্ধির মাধ্যমে $66.90-এ দাঁড়িয়েছে; অন্যদিকে প্ল্যাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের মূল্যের কার্যত কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালারের গতকালের মন্তব্যের জেরে মার্কেটের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে; তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে থাকলে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে তিনি অবস্থান নিতে প্রস্তুত। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে প্রকাশিতব্য আগস্ট মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার (ডিসইনফ্লেশন) কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে—এমনটা উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, "তবে মূল্যস্ফীতি যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উচ্চ পর্যায়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমি সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করব।"
ওই সতর্কবার্তাটির বিষয়বস্তুর তুলনায় ট্রেডারদের প্রতিক্রিয়া বেশ অত্যধিক ছিল। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে ট্রেডারদের প্রত্যাশা সপ্তাহের শুরুর দিকের প্রায় 70% থেকে কমে 50%-এর কাছাকাছি নেমে আসে। স্বর্ণের হোল্ডাররা এই সমন্বয়ের ফলে লাভবান হয়েছেন; কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা আয় পাওয়া যায় না, অথচ নগদ অর্থ ধরে রাখার 'অপর্চুনিটি কস্ট' কমে গেলে স্বর্ণের দর বাড়ে। যারা জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিত কেভিন ওয়ার্শের বক্তৃতার পর ফেড কর্তৃক হকিশ বা কঠোর অবস্থান গ্রহণের প্রত্যাশায় পজিশন ওপেন করেছিলেন তারা এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, উল্লেখ্য যে গত এক সপ্তাহে এই ধরনের ট্রেডারদের সংখ্যাই বেশি ছিল।
ওয়ালার আদৌ নতুন কিছু বলেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমার মতে তিনি নতুন কিছুই বলেননি এবং এটাই মূল বিষয়। তিনি কেবল পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে তিনি আসন্ন প্রতিবেদনের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন—যা ফেড কমিটির যেকোনো সদস্যের জন্য একটি স্বাভাবিক বা প্রথাগত অবস্থান। মার্কেটে তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ হলো, জ্যাকসন হোলে ওয়ার্শের বক্তব্যের পর মার্কেটের 'পজিশনিং' থেকে প্রাপ্ত তথ্যের তুলনায় ট্রেডাররা অনেক বেশি হকিশ বা কঠোর অবস্থান গ্রহণের প্রত্যাশা করেছিল; ফলে ফেড কর্তৃক ডোভিশ বা নমনীয় অবস্থান গ্রহণের প্রথম ইঙ্গিতটিই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে নিজেদের পজিশন গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা উসকে দেয়।
স্বর্ণের জন্য সমর্থনের আরেকটি উৎস ছিল জাপানি কারেন্সি 'ইয়েন'। বৃহস্পতিবার ইয়েনের দর প্রায় 2% বৃদ্ধি পায় এবং গত এক মাস ধরে চলা দরপতনের অনেকটাই পুষিয়ে নেয়; এর কারণ ছিল ব্যাংক অফ জাপানের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনার বিষয়ে ট্রেডারদের ইতিবাচক মূল্যায়ন। মাসখানেক আগে টোকিও ও ওয়াশিংটন কর্তৃক কারেন্সি মার্কেটে যৌথ হস্তক্ষেপের পর এটিই ছিল ইয়েনের জন্য সেরা দিন; এছাড়া পুনরায় এমন হস্তক্ষেপের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা মার্কিন ডলারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন ডলারের মূল্য কমে মে মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, যার ফলে অন্যান্য কারেন্সির হোল্ডারদের কাছে স্বর্ণ হোল্ড করা অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়াটি মার্কিন ডলারের মাধ্যমে কাজ করে এবং একই সাথে দুটি দিক থেকে বুলিয়ন বা স্বর্ণের জন্য সুফল বয়ে আনে। ফেডারেল রিজার্ভের ডোভিশ বা নমনীয় অবস্থান ডলার-ভিত্তিক অ্যাসেটের ইয়েল্ড বা আয় কমিয়ে দেয়; অন্যদিকে, ব্যাংক অফ জাপানের আর্থিক নীতিমালা কঠোর করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুনরায় ইয়েনের দিকে ক্যারি-ট্রেডভিত্তিক মূলধন আকৃষ্ট করে এবং মার্কিন ডলারের দিকে কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার সাপেক্ষে স্বর্ণের মূল্য হ্রাস পায়। এটি এমন একটি বিরল ঘটনা যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম দুটি অর্থনীতির নীতিগত পদক্ষেপ স্বর্ণের মূল্যকে একই অভিমুখে চালিত করছে।
চলতি সপ্তাহটি বেশ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। ইরানের ওপর নতুন করে হামলা এবং কঠোর অবস্থানের হুমকির জেরে মঙ্গলবার স্বর্ণের মূল্যে বড় ধরনের ধস নামে—মাত্র তিনটি সেশনেই এটির মূল্য প্রায় 6% কমে যায়; তবে এরপরই স্বর্ণের মূল্য ঘুরে দাঁড়ায় এবং চল্মান সপ্তাহের সর্বোচ্চ লেভেলে অবস্থান করছে। স্বর্ণের মূল্যের এই ব্যাপক ওঠানামা ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কেটে কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্থিতিশীল প্রবণতা নেই এবং প্রতিটি নতুন সংকেতের বিপরীতে মার্কেটে অত্যন্ত তীব্র অস্থিরতার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
আমার মতে, স্বর্ণের মূল্যের মুভমেন্ট নির্ধারণে আজকের কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রতিবেদনের চেয়ে আগামী সপ্তাহের মুদ্রাস্ফীতি প্রতিবেদন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—যার কথা ওয়ালার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন। যদি আগস্ট মাসের ভোক্তা মূল্য সূচক (CPI) সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মুদ্রাস্ফীতির হার কমে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তবে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা 40%-এর নিচে নেমে আসবে এবং স্বর্ণের মূল্যের $4,600-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি হলে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা আবার 70%-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এবং স্বর্ণের মূল্য কমে প্রায় $4,300-এর লেভেলে নেমে আসতে পারে। এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকিটি হলো ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি: হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে তা একই সাথে তেলের দর ও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ বজায় থাকলেও, সুদের হারের প্রভাবের কারণে এটির দরপতন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বর্ণের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের মূল্যকে নিকটতম রেজিস্ট্যান্স $4,481-এ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এতে করে স্বর্ণের মূল্যের $4,540-এর দিকে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে; যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $4,609 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। দরপতনের ক্ষেত্রে স্বর্ণের মূল্য $4,425 লেভেলে থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। যদি তারা সফল হয়, এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনগুলোর উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং স্বর্ণের মূল্য $4,372-এ নেমে যেতে পারে, ও পরবর্তীতে সম্ভবত $4,304 পর্যন্ত দরপতন হতে পারে।