সপ্তাহান্তে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্যাঙ্কার-কেন্দ্রিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে গেছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের তেলের দর 0.4 শতাংশ বেড়েছে এবং তা জুলাইয়ের শেষের দিকের সর্বোচ্চ মূল্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে; ব্যারেলপ্রতি মূল্য $97-এর উপরেই বজায় রয়েছে।
ইরানের তেলবাহী ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলার জবাবে তেহরান জানিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে অননুমোদিত পথে চলাচলকারী যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে আঘাত হেনেছে। এর আগে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি জাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়েছে—যার মধ্যে একটি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি নয়: কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র একটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। সেখানে নৌ-চলাচল অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে; এর অর্থ হলো—যে প্রণালীতে একসময় বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হত, তা এখন কার্যত সরবরাহ পথ হিসেবে অকার্যকর হয়ে গেছে।
এখানে হামলা এবং তেলের মূল্যের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কটি অত্যন্ত প্রত্যক্ষ এবং দ্রুত কাজ করে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার ফলে বীমার প্রিমিয়াম বেড়ে যায় এবং ওই পথে চলাচল করা জাহাজ মালিকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে; ফলে নৌ-চলাচল কমে যায়, পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও জ্বালানি সরবরাহ হ্রাস পায় এবং মার্কেটে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় মূল্য বেড়ে যায়। এর ফলে লাভবানদের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শেল ও ওই অঞ্চলের বাইরের রপ্তানিকারকরা—যাদের তেলের মূল্য কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই এখন বেড়েছে—এবং সেই সাথে ট্যাঙ্কার মালিকরা, যারা বর্ধিত পরিবহন ভাড়ার কারণে বেশি আয় করছেন। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনকারীরা এবং এশীয় আমদানিকারক ও ইউরোপীয় ভোক্তারা, যাদের জন্য জ্বালানির উচ্চমূল্য মুদ্রাস্ফীতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মনোভাব থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, কেউই পিছু হটতে রাজি নয়। একসময় যুদ্ধবিরতি আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ পাল্টা আঘাতের নীতির সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, "খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা উচিত যে খেলার নিয়ম বদলে গেছে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, ইরানের স্বার্থ বা নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে "আরও দ্রুত, আরও কঠোর এবং আরও যন্ত্রণাদায়ক পদক্ষেপ" নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন যে, সেখানে মার্কিন নৌ-উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একার দায়িত্ব হওয়া উচিত নয়; তবে ইরান যতক্ষণ না তাদের নীতি বা সরকার পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ আমাদের তাদের মোকাবিলা করতে হবে।"
ট্রেডারদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টি হলো ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের একটি ঘোষণা: তিনি জানিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালীর বাইরে একটি নতুন 'নিষেধাজ্ঞা অঞ্চল' ঘোষণা করা হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধের রেখা থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: এখন পর্যন্ত সংঘাতটি হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল; কিন্তু এই এলাকাটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে প্রসারিত হলে তা এমনসব জলসীমাকে প্রভাবিত করবে যেখানে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস রপ্তানি টার্মিনালগুলো অবস্থিত।
সংঘাত যদি বর্তমান গতিতেই বাড়তে থাকে, তবে কী ঘটবে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ট্যাংকারে হামলার সংখ্যার চেয়ে 'নিষেধাজ্ঞা-বলয়' বা 'এক্সক্লুশন জোন' নির্ধারণের বিষয়টিই হবে পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর মূল কারণ। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনকারীরা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে তেল পরিবহন করলেও মার্কেটে সরবরাহের ঘাটতি সত্ত্বেও কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা-বলয় যদি টার্মিনালগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তবে পরিস্থিতি কেবল 'সীমিত পরিবহন' থেকে 'উৎপাদন বন্ধ' হওয়ার পর্যায়ে চলে যাবে; আর এমন পরিস্থিতিতে তেলের দর এখনকার থেকে অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে।
ওয়াশিংটনের বক্তব্য এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যকার পার্থক্যও বেশ উল্লেখযোগ্য। শুক্রবার ট্রাম্প এই সংঘাতকে 'ছোটখাটো' ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স বলেছেন যে তিনি একে যুদ্ধ বলতে রাজি নন। অথচ গত ছয় মাসে ১৮ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন, প্রচুর গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে এবং জনমত জরিপে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি জনসমর্থনের দুর্বল চিত্র ফুটে উঠেছে—এটি এমন এক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আমার মনে হয়, সামরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার চেয়ে বরং এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাই নভেম্বরের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাত বাড়ানোর প্রবণতাকে সীমিত করে রাখবে।
আমার ধারণা, উত্তেজনা যদি বর্তমান মাত্রায় এগুলোতে থাকে, তাহলে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি $100–$110-এর মধ্যে অবস্থান করবে এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের বাজার আরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেল বিক্রির মার্জিন ইতোমধ্যেই রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পারস্য উপসাগরের একটি অংশকে ঘিরে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো 'এক্সক্লুশন জোন' বা প্রবেশ-নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করা হয়, তবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দর বেড়ে $130-এ পৌঁছে যেতে পারে। তবে আমি এর বিপরীত পরিস্থিতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছি না; যেখানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে ওয়াশিংটন দ্রুত কোনো সমাধানের পথ খুঁজতে বাধ্য হতে পারে এবং তেলের মূল্য একইভাবে দ্রুত কমে $80-এর কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $92.50-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $96.54-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $100.40 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $89.54-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $87.08 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $84.40 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।