শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান সেরা মডেলগুলোর উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন—আর ট্রেডাররা তা আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করেছে

বৃহত্তম এআই কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তির উন্নয়নে গতি কমানোর আহ্বান জানানোর পর আজ বিশ্বব্যাপী স্টক সূচক ও ফিউচার মার্কেটে নিম্নমুখী প্রবণতার সাথে লেনদেন শুরু হয়েছে। MSCI এশিয়া প্যাসিফিক সূচক 0.8% হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে এআই-ভিত্তিক বিনিয়োগের সূচক দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক 3.4% হ্রাস পেয়েছে। এসকে হাইনিক্স এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স উভয়েরই স্টকের মূল্য 4%-এর বেশি কমেছে। নাসডাক-100 ফিউচার 1.3% এবং S&P 500 ফিউচার 0.6% হ্রাস পেয়েছে।

এর সূত্রপাত হয়েছিল শনিবার অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেইর এক বিবৃতির মাধ্যমে; তিনি স্বাধীনভাবে তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনা-সহ বাড়তি কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘোষণা দেন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতকে সবচেয়ে উন্নত মডেলগুলোর উন্নয়ন প্রক্রিয়া ধীর করার আহ্বান জানান। ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানান এবং এক্সএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক বলেন যে আমোদেই সঠিক কথাই বলেছেন। পাশাপাশি, অল্টম্যান ট্রেডারদের জানিয়ে দেন যে ওপেনএআই এ বছর আইপিও আনছে না—যা সফটব্যাংকের পূর্বাভাসের ওপর আরেকটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্রেডাররা এই সংকেতগুলোকে অত্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছে। উন্নয়নের গতি কমে আসার অর্থ হলো কম্পিউটিং অবকাঠামো খাতে মূলধনী ব্যয়ের সংকোচন; আর এই ব্যয়ের ওপরই মেমোরি নির্মাতা থেকে শুরু করে ডেটা-সেন্টার পরিচালনাকারী—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলটি টিকে থাকে। চিপ নির্মাতা ও অবকাঠামো নির্মাতা কোম্পানিগুলো—যাদের স্টকের মূল্য মূলত এআই খাতে অব্যাহত বিনিয়োগের ধারণার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়—এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও, এতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো লাভবান হতে পারে; কারণ উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার এই আহ্বান পশ্চিমা শিল্পখাত সংশ্লিষ্টরা শেষ পর্যন্ত কতটা নিষ্ঠার সাথে মেনে চলবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কতটা গুরুতর? এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে পড়েছেন, কারণ এই মন্থরগতি শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়াবে তা অস্পষ্ট। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা কম; কারণ এআই এখনও বিশ্বের মূল এবং দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে টিকে আছে। বরং এই শিল্পখাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই খাতটি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে উন্নয়নের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাময়িক মন্থরগতি চাইছে—এটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

একইদিনে এআই খাতের ধাক্কাটির সাথে জ্বালানি তেলখাতকে ঘিরে আরেকটি ধাক্কা যুক্ত হলো। সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়ায় এবং ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে পরিকল্পিত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের তেলের দাম 2.2% বেড়ে প্রতি ব্যারেল $106.95-এ পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, গত মাসে সৌদি আরবের তেল উৎপাদনের হার ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল।

বন্ডের মার্কেটেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে দেখা যায়নি। বর্তমানে ১০-বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বা লভ্যাংশ 4.96%-এর কাছাকাছি অবস্থান করছে; উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের পর থেকে এই হার আর কখনোই 5%-এর উপরে পৌঁছায়নি। আগস্ট মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ার জেরে বুধবার ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন প্রায় 90%-এ দাঁড়িয়েছে, যা গত সপ্তাহে ছিল প্রায় 70%।

চলমান সপ্তাহটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ পরপর তিনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত বছরের শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত প্রত্যাশাকে নতুন রূপ দিতে পারে। জ্বালানি তেলের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি—বিশেষ করে ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সপ্তাহে ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অফ জাপান—উভয়ই আর্থিক নীতি কঠোর করতে পারে; এর ফলে বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসেটের দরবৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং স্টক সূচকগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

আমার ধারণা হলো, বুধবারের বৈঠকে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াবে এবং আগামী দিনগুলোতে ১০-বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড বা লভ্যাংশের হার 5% অতিক্রম করবে। আমি আরও মনে করি, প্রযুক্তি খাতভিত্তিক স্টকের বর্তমান দরপতন বা 'কারেকশন' স্বল্পস্থায়ী হবে; কারণ এখানে মূল বিতর্কটি হলো এই খাতের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার গতি ধীর করা নিয়ে, বিনিয়োগ পুরোপুরিভাবে বন্ধ করা নিয়ে নয়। কম্পিউট অবকাঠামোর চাহিদা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই খাতের জন্য আসল পরীক্ষাটি হবে অর্থের ব্যয় বা সুদের হার নিয়ে: বন্ডের ইয়েল্ড বা লভ্যাংশ 5% ছাড়িয়ে গেলে, উন্নয়নের গতি নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, স্টকের অত্যধিক উচ্চ মূল্যায়নের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়বে। এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকিটি হলো নিয়ন্ত্রণমূলক বা আইনি পদক্ষেপ—যদি উন্নয়নের গতি ধীর করার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমর্থন পায় এবং বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে এই দরপতন স্বল্পস্থায়ী না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

টেকনিক্যাল প্রেক্ষাপট অনুযায়ী S&P 500 সূচকের ক্রেতাদের প্রধান কাজ হবে সূচকটির মূল্যের 7,633-এর নিকটতম রেজিস্ট্যান্স অতিক্রম করানো। এটি আরও উর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিশ্চিত করবে এবং 7,656-এর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করবে। সূচকটির দর 7,679-এর উপর ধরে রাখাও ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ফলে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। যদি ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা কমে গিয়ে দরপতন হয়, তাহলে সূচকটির দর 7,607-এ থাকা অবস্থায় ক্রেতাদের সক্রিয় হতে হবে। এই লেভেল ব্রেক করে নিম্নমুখী হলে সূচকটির মূল্য দ্রুত 7,583-এ নেমে যেতে পারে এবং 7,563 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনা রয়েছে।