যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পুনর্বিন্যাসের খবর প্রকাশের পর জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বৃহস্পতিবার 4% বৃদ্ধির পর ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের জ্বালানি তেলের দর প্রায় 0.4% বেড়ে প্রতি ব্যারেল 102.74-এ পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি 'স্ট্রাইক গ্রুপ' বা বিশেষ নৌ-বহর মোতায়েনের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে মার্কেটে এই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
এর কারণ ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পেন্টাগনের নতুন করে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরী এবং ১০ হাজার নৌ ও মেরিন সেনা পাঠানো হচ্ছে; এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে ইরানের ওপর হামলা জোরদার করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বাড়তি বিকল্প থাকবে। বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, 'ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট' নামের বিমানবাহী রণতরীটি ইতোমধ্যে স্যান ডিয়েগো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওনা হয়েছে। এটি সেখানে পৌঁছালে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি 'ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ' বা বিমানবাহী রণতরী-কেন্দ্রিক বিশেষ নৌ-বহর উপস্থিত থাকবে—যা এপ্রিলের শেষভাগে থাকা বহরের সংখ্যার সমান। তবে এই সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মোতায়েনকৃত নৌবহরের বিন্যাসটি ইতিহাসের একটি বিরল ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' এই অঞ্চলে অবস্থান করছে, অথচ 'ইউএসএস জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ' সাময়িকভাবে এলাকাটি ত্যাগ করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে এ বছরের অভিযানের আগে, সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একই সাথে তিনটি 'ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ' মোতায়েন রেখেছিল। সুতরাং, এই পুনর্বিন্যাসের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা গত দুই দশকের বৃহত্তম সামরিক অভিযানগুলোর সাথে তুলনীয়; এটি কোনো সাধারণ বা নিয়মিত রদবদল নয়।
ট্রাম্পের সরাসরি বক্তব্যের প্রেক্ষাপটেই এই বিমানবাহী রণতরীগুলো মোতায়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন যে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর আরও জোরালো সামরিক হামলা চালানো "সম্ভব"; অর্থাৎ তিনি এই উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টিকে নিছক সামরিক প্রয়োজনের চেয়ে বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সময়সূচির সাথে যুক্ত করেছেন।
কাতার ও সৌদি আরবে অবস্থিত তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোর সুরক্ষার জন্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্ অতিরিক্ত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (মিসাইল ব্যাটারি) পাঠিয়েছে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারদের আশ্বস্ত করা যে, নতুন কোনো হামলা হলে ওয়াশিংটন তাদের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে সুরক্ষা দেবে। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় কেন কেবল হামলার ঘটনাতেই নয়, বরং হামলার প্রস্তুতির খবরেও তেলের মূল্যের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এই বর্ধিত উপস্থিতির বিষয়টি বেশ ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময়ের জন্য ওই অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রাখাই নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে; আর দীর্ঘমেয়াদে তিনটি রণতরী মোতায়েন রাখা হবে আরও অনেক বেশি কঠিন ও কষ্টসাধ্য। এর ফলে নৌবাহিনীর কর্মী ও নৌবহরের প্রস্তুতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যদিও একই সময়ে কমান্ডারদের জন্য কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সাময়িক সুবিধা তৈরি হয়।
আমার মতে, তৃতীয় বিমানবাহী রণতরীটি পুনরায় মোতায়েন করার অর্থ এই নয় যে নতুন করে হামলা অনিবার্য হয়ে পড়েছে; কারণ এই উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। তাছাড়া, ট্রাম্প উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টিকে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ের সাথে যুক্ত করেছেন, যা তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকেরই বেশি ইঙ্গিত দেয়। আমি এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না যে, এ ধরনের খবরের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যের আবারও বড় ধরনের উত্থান ঘটতে পারে। তবে সংঘাত বা বৈরিতা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি না পেলে পরবর্তী সময়ে তেলের কিছুটা দরপতন হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি—যেমনটা অতীতে আগ্রাসী সামরিক মনোভাব বা উত্তপ্ত বার্তা বিনিময়ের পর দেখা গিয়েছিল।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $92-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $96-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $100 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $89-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $87 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $83 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।