হোয়াইট হাউস পেন্টাগনকে ইরানের ওপর এমন সব হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে বলেছে যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই চালানো সম্ভব—এমন খবর প্রকাশের পর জ্বালানি তেলের দর বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের তেলের দর প্রায় 2.7% বেড়ে প্রতি ব্যারেল $104-এ পৌঁছেছে এবং ডব্লিউটিআই গ্রেডের তেলের দর 2.3% বেড়ে $91-এর কাছাকাছি অবস্থান করছে।
সামরিক হামলার বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে—এমন খবর সেই প্রচলিত ধারণার বিপরীত, যেখানে মনে করা হচ্ছিল যে আগামী মাসের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সাথে সংঘাত থেকে বিরত থাকবেন। তবে এটি স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য হামলার পরিসর ও লক্ষ্যবস্তু—এবং আদৌ এ পথে এগোনো হবে কি না—তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে; আর নির্বাচনের পর সীমিত কোনো অভিযানের পাশাপাশি আরও কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। এই সূক্ষ্ম বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ: আগে ট্রেডারদের ধারণা ছিল জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়লেও তা পূর্বাভাসযোগ্য হবে; কিন্তু এখন এমন এক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে—যেখানে মার্কিন ভোটারদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক মুহূর্তে সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ধেয়ে আসা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় 'ইসাইয়াস'-এর কারণে মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা দৈনিক 510,000 ব্যারেলেরও বেশি উৎপাদন স্থগিত করেছেন, যা ওই অঞ্চলের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ঝড়টি পরবর্তীতে হারিকেনে রূপ নেয় এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলে আঘাত হানার কথা রয়েছে। পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ সংকটের আশঙ্কার কারণে ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের তেলের মূল্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে; বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ ইতোমধ্যেই তলানিতে ঠেকেছে।
তবে হরমুজ প্রণালীটিই এখনও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হচ্ছে—যা যুদ্ধের আগের পরিমাণের প্রায় সমান এবং চলতি সপ্তাহে উক্ত শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট কিছু পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। অথচ সম্প্রতি ভিটোল-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দৈনিক প্রায় ১২ মিলিয়ন ব্যারেলের কথা উল্লেখ করেছেন এবং শেল-এর প্রধান জানিয়েছেন যে, এর পরিমাণ যুদ্ধের আগের সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ। তথ্যের এই অসঙ্গতিই বুঝিয়ে দেয় কেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সংবাদ শিরোনামের বিষয়ে সংশয় পোষণ করেন।
সরবরাহ বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য একটি বিশাল আকারের ট্যাঙ্কার ভাড়া করতে এখন $77 মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে; অথচ গত বছর এর গড় খরচ ছিল $9.2 মিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ খরচ প্রায় 8.5 গুণ বেড়েছে। সিটিগ্রুপ এই পরিবহন ব্যয়কে 'বিপুল' বা 'অস্বাভাবিক রকমের বেশি' বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্যের পেছনে কেবল রপ্তানির পরিসংখ্যানই নয়, বরং ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোও প্রভাব ফেলছে।
জাহাজগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইউকেএমটিও-র তথ্য অনুযায়ী, গতকাল কাতারের উপকূলে একটি ট্যাঙ্কার হামলার শিকার হয়েছে এবং এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে; প্রায় এক মাসের মধ্যে পারস্য উপসাগরের গভীরে এটিই প্রথম নথিভুক্ত হামলার ঘটনা। ইয়েমেন পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উত্তপ্ত রয়েছে: ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করেছে এবং এর জবাবে রিয়াদের নেতৃত্বাধীন জোট ৮২টি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে। বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে নতুন করে সংঘাত শুরুর ফলে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি পণ্য রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে; উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হয়ে উঠেছে।
আমার মতে, আগামী সেশনগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের জ্বালানি তেলের মূল্য মোটামুটি $100–$105-এর রেঞ্জের মধ্যে ওঠানামা করবে; আর যদি মার্কিন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তবে উক্ত গ্রেডের তেলের মূল্য দ্রুত $105-এর উপরে উঠে যাবে। যদি হারিকেনটি বড় কোনো জ্বালানি অবকাঠামো এড়িয়ে যায় এবং উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসে, তবে ঝুঁকির কারণে সৃষ্ট বাড়তি মূল্য কিছুটা কমে আসতে পারে; তবে উচ্চ পরিবহন খরচ এবং ডিজেলের ঘাটতির কারণে ব্রেন্টের দর সম্ভবত $100-এর কাছাকাছিই থাকবে। মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে এটি একটি দুঃসংবাদ: কারণ এতে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সুযোগ কমে যায় এবং ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে জোরালো হয়। চূড়ান্ত বিষয়টি নির্ভর করবে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর—হোয়াইট হাউস ইরানে হামলার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা বা আশংকার জন্য তেলের ক্রেতাদের বাড়তি মূল্য গুণতেই হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $92-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $96-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $100 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $89-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $87 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $83 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।